অধিকৃত ফিলিস্তিনের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সাইবার যোদ্ধারা
মনস্তাত্ত্বিক উন্নত রণকৌশল গ্রহণ করে সাইবার জগতে ইহুদিবাদী ইসরাইলকে
নাস্তানাবুদ করে তুলেছে। গাজায় ইহুদিবাদী আগ্রাসনের ভয়াবহতা বাড়ার পাশাপাশি
ইসরাইলে সাইবার হামলার পরিমাণ পূর্বের তুলনায় অন্তত ১০ গুণ বেড়েছে বলে
ইহুদিবাদী সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। গত মাসের প্রথম সপ্তাহের
পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার রিসার্চ সেন্টারের
প্রধান আইজ্যাক বেন-ইসরাইল হিসাবে বলা হয়েছে, সাধারণত ইসরাইলের
গুরুত্বপূর্ণ সাইটগুলোর বিরুদ্ধে দৈনিক এক লাখ সাইবার হামলা হয়। কিন্তু
গাজায় আগ্রাসনের পর থেকে গড়ে দৈনিক ১০ লাখ সাইবার হামলার শিকার হচ্ছে এ সব
সাইট।অবরুদ্ধ গাজা থেকে ইসরাইলি অবস্থানগুলোতে রকেট বৃষ্টি, ইসরাইলি আকাশ সীমায় ড্রোন হামলার পাশাপাশি সাইবার হামলা ও হ্যাকিংয়ের মধ্য দিয়ে ইহুদিবাদীদের জন্য মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে হামাস। হামাসের সাইবার সেনারা একাধারের টুইটার, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাঠানো এসএমএস এবং উপগ্রহ সম্প্রচারের মাধ্যমে যে সব বার্তা প্রেরণ করছে তা ইহুদিবাদী ইসরাইলে গভীর আতংকের সৃষ্টি করছে। ইহুদিবাদীদের স্নায়ুর ওপর এ ভাবে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং তাদেরকে দুঃস্বপ্ন, হতাশা ও মানসিক পীড়নের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। ব্লুমবার্গ ডট কমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পরোক্ষা ভাবে এ সব নিশ্চিত করেছেন ইহুদিবাদী ইসরাইলের ন্যাশনাল সাইবার ব্যুরোর প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার রিসার্চ সেন্টারের প্রধান আইজ্যাক বেন-ইসরাইল।
তিনি জানান, হাইফার পেট্রোরাসায়নিক প্ল্যান্টে হামাসের কম্যান্ডোর হামলা করেছে এমন এক বার্তা পেয়েছেন তার মোবাইল ফোনে। আর এ বার্তা ইসরাইলি দৈনিক হারতেজ পাঠিয়েছে বলে দৃশ্যত মনে হচ্ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে আসে দৈনিকটি এ জাতীয় কোনো বার্তা পাঠায় নি বা এ জাতীয় খবর প্রকাশ করে নি। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। আতংক ছড়িয়ে পড়েছে ইসরাইলে। এ ছাড়া হামাসের পরবর্তী সাইবার হামলা এর চেয়ে মারাত্মক হবে তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না বলে জানান তিনি।
গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হামাসের সাইবার যোদ্ধারা ইহুদিবাদী ইসরাইলের জনপ্রিয় ডোনিনো’জ পিৎজ্জার ফেসবুক পাতা হ্যাক করে একটি বার্তা সেটে দেয়। এতে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজা উপত্যকায় হামাসের নিয়ন্ত্রণে আনুমানিক ১০ হাজার রকেট রয়েছে। এ সব রকেট বহরের এক পঞ্চমাংশ দিয়ে এক দিনে ইহুদিবাদী ইসরাইলের অবস্থানগুলোর ওপর একযোগে হামলা চালানো হবে। ইহুদিবাদীদের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ তাদের নাম ব্যবহারে করে এ সংক্রান্ত ভুয়া টেক্সক্ট বার্তা ইসরাইলে প্রচারিত হয়েছে। কাল্পনিক রকেট হামলা এবং আহতদের বিবরণও দেয়া হয়েছে এতে।
হামাস এবং ইসলামি জ্বিহাদের সাইবার গেরিলারা দিনরাত তৎপর রয়েছেন। ইসরাইলি সাইবার কেন্দ্রের ওপর অব্যাহত হামলা করছেন তারা। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের সাইবার যোদ্ধাদের সঙ্গে সমন্বয় গড়ে তুলেছেন ভারচুয়াল জগতের গেরিলা যোদ্ধারা। ২০১২ সালে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের দিনগুলোতেও একই ভাবে সাইবার হামলা হয়েছে ইসরাইলে। আটদিনের এ যুদ্ধের সময়ে ইহুদিবাদী ইসরাইলের সরকারি সাইটগুলোতে হামলার জন্য বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল হামাস। সে সময়ে ইসরাইলি গুরুত্বপূর্ণ সাইটগুলোর বিরুদ্ধে চার কোটি ৪০ লাখ সাইবার হামলা হয়েছিল। ইসরাইলি কম্পিউটার বিশেষজ্ঞরা সে সময়ে নাজেহালের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
অবশ্য ইসরাইল সে সময়ে যে সব কম্পিউটার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল তার কোনো কোনোটি এবারের হামাসের হামলায় নস্যাৎ হয়ে গেছে। কিংবা এ গুলোর বিরুদ্ধে হামাসের সাইবার যোদ্ধাদের শাণিত আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
গত মাসের ৩ তারিখে ইসরাইলি সেনা মুখপাত্রের টুইটার পেইজ দখল করে নেয় হামাস যোদ্ধারা। তারা এ থেকে বার্তা ছড়িয়ে দেয় যে হামাসের রকেট দিমোনা পরমাণু চুল্লিতে আঘাতের পর সেখান থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী পরে এ খবরের সত্যতা অস্বীকার করেছে। এ ছাড়া তাদের মুখপাত্রের পেইজ কী ভাবে হ্যাক করা হলো তা নিয়ে তদন্ত করছে।
হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জাদ্দিন আল-কাসসাম বিগ্রেডে গত মাসের ১৬ তারিখে ইসরাইলি মোবাইল ফোনগুলোতে হিব্রুতে একটি বার্তা পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিরা দিমোনা থেকে হাইফা পর্যন্ত ইসরাইলের প্রতিটি অংশ দ্রুততার সঙ্গে আঘাত হানতে পারে এবং এতে ইসরাইলিরা আতংকে ইঁদুরের মতো দৌড়ে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ঢুকবে।
জেরুজালেমের উপকণ্ঠে অবস্থিত বেনিয়ামিনের ইসরাইল আঞ্চলিক পরিষদ জানিয়েছে, ইসরাইলিদের মোবাইল ফোনগুলো হ্যাক করা হয়েছে এবং ফোনের ঠিকানা হাতিয়ে নিয়ে এ জাতীয় বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
গত মাসের ১৪ তারিখে চ্যানেল ১০-এর নিয়মিত অনুষ্ঠানমালার স্থানে হঠাৎ করে প্রচারিত হয়েছে হিব্রুবার্তা। এ বার্তায় বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী থেকে সন্তানদের ঘরে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে ইসরাইলি মায়েদের প্রতি। তানা হলে তারা ধরা বা মারা পড়বে। এ বার্তা কে, কিভাবে দিয়েছে তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ছাড়া, এ বার্তা ইসরাইলিদের কতোটা আতংকিত করেছে তাও অনুমানের অপেক্ষা রাখে না।
এ ছাড়া, সার্ভারে হামলা করে ইহুদিবাদী ইসরাইলের নেটভিশন লি এবং বেজেক ইন্টারন্যাশনাল লি.-এর মতো ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দিয়েছে হামাস।
সুত্র : রেডিও তেহরান




