সচিব কমিটিতে উঠছে সরকারি কর্মচারী আইন
বাংলা নিউজ ডেস্ক
কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হলেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হলে গ্রেপ্তার করা যাবে।
চার্জশিট দেওয়ার আগে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন হলে সরকারের আগাম অনুমতি নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বেলায়। তারা কোনো সরকারি চাকরিজীবীর বিরুদ্ধে মামলা করলে তাঁকে গ্রেপ্তারে আগাম অনুমতি নিতে হবে না। আর কোনো আদালতে সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হলে তা অনতিবিলম্বে সরকারকে জানাবেন আদালত।
এমন বিধান রেখে ‘সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৭’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রও মিলেছে। আগামী মঙ্গলবার প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠকে খসড়াটি অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। পরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন নিয়ে বিল আকারে সংসদে তোলা হবে।
আইনবিদরা বলছেন, আমলারা নিজেদের সুবিধার জন্য এ ধরনের আইন প্রণয়ন করছেন।
এতে বিশ্বব্যাপী আইনের যে মূল নীতি, ‘আইন সবার জন্য সমান’ তা আর কার্যকর থাকবে না। বরং সরকারি চাকরিজীবীরা আইনের দৃষ্টিতে অন্য সবার চেয়ে ঊর্ধ্বে অবস্থান করবেন।
যদিও প্রশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক আমলাদের মত হলো, সরকারি চাকরিজীবীরা যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে জন্য তাঁদের হাত খোলা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে অন্যায় করলে শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
২০১৫ সালের ১৩ জুলাই মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করে। গত বছরের ২৪ নভেম্বর তা মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তোলা হলে সেখান থেকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে তা পুনরায় উত্থাপন করতে বলা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার নির্দেশনা অনুযায়ী খসড়া সংশোধন করে এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন করা হয়েছে।
চূড়ান্ত করা খসড়ার ৪৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সহিত সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হইবার পূর্বে তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে হইলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করিতে হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধীন দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে অনুরূপ অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হইবে না। ’ দুদকের মামলায় সরাসরি গ্রেপ্তারের সুযোগ বাদ দিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুপারিশ করেছিল মন্ত্রিপরিষদ। তবে খসড়াতে এটি বহাল রাখা হয়েছে।
৪৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি বিচারকারী আদালতের গোচরীভূত হয় যে, তাহার আদালতে বিচারাধীন কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন সরকারি কর্মচারী, তাহা হইলে আদালত অনতিবিলম্বে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করিবেন। ’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি কর্তব্য পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হলে সে ক্ষেত্রে চার্জশিট দেওয়ার আগে গ্রেপ্তারের বেলায় সরকারের অনুমোদন নেওয়ার কথা থাকলে তাতে আইন সবার জন্য সমান হবে না, তা নয়। পুলিশকে গুলি করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু মামলা হলেই গ্রেপ্তার করা হলে নিতান্ত প্রয়োজনেও অনুমতি না নিয়ে পুলিশ কোনো জায়গায় গুলি চালাতে পারবে না।
আলী ইমাম মজুমদার আরো বলেন, সরকারি কর্মচারীদের কাজ করার জন্য হাত খোলা রাখা দরকার। এটি সুশাসনের জন্য সহায়ক হবে। তবে তাদের ওপর তদারকিও করতে হবে। নিজেদের লাভের জন্য যদি তারা অন্যায় কিছু করে, তাহলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, শত বছরের পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলায় তদন্তের আগে যেকোনো সময় কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ বা সরকারি কোনো সংস্থা। এই গ্রেপ্তার সাধারণত তদন্তের স্বার্থেই করা হয়। কোনো মামলায় চার্জশিট হয়ে গেলে তদন্তের আর কিছু থাকে না। কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে চার্জশিট হওয়ার আগে গ্রেপ্তার করা যাবে না—এ রকম আইন করা হলে সেটি হবে অদ্ভুত আইন। স্পষ্ট ফৌজদারি কার্যবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ড. শাহদীন মালিক আরো বলেন, ‘এ রকম মারপ্যাঁচওয়ালা অযৌক্তিক আইনের আবিষ্কারক নিজেদের বাঁচানোর স্বার্থেই করতে চাচ্ছেন আমলারা। দুর্নীতি বা অন্য কোনো অপরাধ থেকে নিজেদের রক্ষা করার অবৈধ হাতিয়ার হবে আইনটি। আমলারা এই আইন ছাড়াও নিজেদের দায়মুক্তির আরো নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করতে পারেন। ’
খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় এক বছরের বেশি মেয়াদে কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে দণ্ড আরোপের রায় বা আদেশ দেওয়ার তারিখ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি বরখাস্ত হবেন। বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তি পরে আপিল আদালতে খালাস পেলে চাকরিতে পুনর্বহাল হতে পারবেন। আর এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাঁকে তিরস্কার, নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, বেতন স্কেলের নিচের ধাপে নামানো, নিম্নপদে নামানো, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, চাকরি থেকে অপসারণ ও বরখাস্ত করতে পারবে। তবে সাজা এক বছরের বেশি বা কম যা-ই হোক না কেন, উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতি শাস্তি মওকুফ, কমানো ও চাকরিতে পুনর্বহাল করতে পারবেন।
কোনো সরকারি কর্মচারীকে এ আইনের অধীনে চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করা হলে তিনি শুধু ভবিষ্যৎ তহবিলে নিজের জমা রাখা টাকা ও তার সুদ বাদে আর কোনো সুবিধা পাবেন না। এ ছাড়া চাকরিকাল ২৫ বছর পূর্ণ হলে যে কেউ স্বেচ্ছায় অবসরে যেতে পারবেন, সরকারও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের পদোন্নতি বিষয়ে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীকে মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরি বিবেচনা করে পদোন্নতি দিতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কাউকে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে না। যেসব ক্ষেত্রে সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশ দরকার, সেসব ক্ষেত্রে সুপারিশ নিয়ে এবং বাকি ক্ষেত্রে সরকার গঠিত কমিটি, বোর্ড বা কর্তৃপক্ষের সুপারিশের ভিত্তিতে পদোন্নতি দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০১৫ সালে মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া খসড়ায় বলা হয়েছিল, ‘পদোন্নতিযোগ্য কর্মচারীকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা না হলে তার কারণ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর জানার অধিকার থাকিবে। ’ এ ছাড়া কিছু শর্ত বাদে কোনো সংস্থার প্রতিবেদনকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিশেষ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে সচিব কমিটির জন্য চূড়ান্ত করা খসড়ায় এসব বিধান রাখা হয়নি। ফলে নতুন আইন হলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের বিষয়টি বিবেচনা করার আশঙ্কা থাকবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো কর্মচারী নিয়োগের পর প্রথম দুই বছর তাঁর শিক্ষানবিশকাল থাকবে। তবে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে এর মেয়াদ আরো দুই বছর পর্যন্ত বাড়াতে পারবে। আর স্থায়ী হওয়ার পর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পেলে নতুন পদে প্রথম এক বছর শিক্ষানবিশকাল শেষে স্থায়ী হবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশকাল না রাখার পক্ষে মতামত দিলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা খসড়ায় তা বহাল রাখা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশকাল সন্তোষজনক মনে না হলে তাঁকে যে পদ থেকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, সেই আগের পদে প্রত্যাবর্তন করা হবে।
নতুন আইনে রাষ্ট্রপতির বিশেষ এখতিয়ার থাকছে। বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে, বিশেষ মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও অপরিহার্যতা বিবেচনা করে সরকারের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদসংখ্যার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পদে নিয়মিতভাবে নিয়োগযোগ্য কর্মচারীদের বাইরে কোনো ব্যক্তিকে প্রেষণ বা চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে পারবেন।
কর্মচারী সংগঠনগুলোর আপত্তি সত্ত্বেও আইনের খসড়ায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেবা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য খসড়া পাঠিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, খসড়াটি ভেটিংয়ের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাওয়া মতামত সন্নিবেশ করা হয়েছে। এ জন্য সচিব কমিটিতে উপস্থাপনের আগে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের সম্মতি নিয়ে সচিব কমিটির সভায় আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য সংবিধানে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্বাধীনতার পর এত দিনেও তা করা সম্ভব হয়নি। ২০১০ সালে গণকর্মচারী আইনের খসড়া করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ওই খসড়ার কয়েকটি বিষয়ে বিরোধিতা করলে তা বাতিল করা হয়। পরে ২০১২ সালে সরকার নতুন খসড়া তৈরি করে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, ছুটি, পদায়ন, প্রেষণ, লিয়েন, শৃঙ্খলা ও আচরণ, অবসর, পদত্যাগ, পদোন্নতি, কর্মমূল্যায়ন, শিক্ষানবিশি ও স্থায়ীকরণ, উদ্বৃত্ত কর্মচারী আত্তীকরণ, কল্যাণ ও সহায়তা, সরকারি সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে সুুনির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায় এত দিন এসব কর্ম সম্পাদনে পাবলিক সার্ভেন্ট (রিটায়ারমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৭৪, সার্ভিসেস (রিঅর্গানাইজেশন অ্যান্ড কন্ডিশনস) অ্যাক্ট, ১৯৭৬, উদ্বৃত্ত কর্মচারী আত্তীকরণ আইন, ২০১৬, গভর্নমেন্ট সার্ভেন্টস (স্পেশাল প্রভিশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯, পাবলিক সার্ভেন্টস (ডিসমিশাল অন কনভিকশন) অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫ এবং পাবলিক এমপ্লয়িস ডিসিপ্লিন (পাংকচুয়াল অ্যাটেনডেন্স) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২-এর আওতায় এসব কাজ করা হতো। সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৭-এর খসড়া আইনে পরিণত হলে এসব আইন ও অধ্যাদেশ রহিত হয়ে যাবে।





